
কাজী ফিরোজ # দোষে গুণে মানুষ। দোষের চেয়ে যদি গুণের ভাগ বেশি হয় তাহলে লোকটাকে ভালোই বলতে হবে। যদিও আমরা বাঙালি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের ভালোটা চোখে দেখিনা। আর যারা দলবাজি করেন চোখে তাদের প্রতিপক্ষের কোনো গুণই ধরা পড়েনা।
শাহ মো. আবু জাফর ভুলের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে এখোন একজন কক্ষচ্যুত নক্ষত্র। তাই বলে তাঁর অর্জনকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। তিনি ভুল করেছেন বলেইতো সর্ব জনাব আব্দুর রউফ মিয়া, কাজী সিরাজুল ইসলাম এবং আব্দুর রহমান সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর অবর্তমানে বাকিরা যেভাবে সম্মানিত হয়েছেন, তানাহলে তাঁরা হয়তো অন্যভাবে সম্মানিত হতেন।
ফরিদপুর-১ আসনে একমাত্র ব্যক্তি যিনি আন্তর্জাতিক শ্রমিক অঙ্গনে স্বনামে খ্যাত। তাঁর অনুপস্থিতি সেখানেও শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
শেষ বিকেলের সূর্যকে দিয়ে সূর্যের তেজ বিচার করা যাবেনা। এখোন শাহ মো. আবু জাফরও বিদায়ী সূর্যের মতো। আমরা তাঁর ভুল অধ্যায়টা বাদ দিয়ে যদি তাঁকে বিচার করি তাহলে এই আসনে তিনি আন প্যারালাল। ফ্লাশব্যাক টানলে শাহ মো. আবু জাফর তরুণদের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত অধ্যায়কে চিত্রায়িত করলে যে কোনো রোমাঞ্চকর মুভি (থ্রিলার)কে হার মানাবে। ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ভিপি নির্বাচিত হওয়া, ছাত্রত্ব শেষ হতে না হতেই বাঘাবাঘা নেতাদের টপকে জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়াটাও ছিলো এক ইতিহাস।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি প্রায় বছর তিনেক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। কখনো কুলি, কখনো রিক্সা চালক, কখনো দরবেশ আবার কখনো ফেরিওয়ালা। এ সময়ে তিনি বিভিন্ন বিশ্বস্ত লোকের বাড়িতে রাত্রি যাপন করেছেন। ছদ্মবেশ কালে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। আবার কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে যমের মতো ডরাতেন।
শাহ মো. আবু জাফরের পিছনে কাজ করায় তাঁর অনুসারীদের অন্যরকম ভালোলাগা ছিলো। ১৯৭৮ সালের শেষ দিকের কথা। ছাত্রলীগের মিছিল চলছে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন এম.এম. মোশাররফ হোসেন মুসা মিয়া, কাজী ইমদাদুল হক লুলু, এম.এম.আসাদুজ্জামান মিন্টু। ছাত্রদের মিছিল দেখতে দেখতে রুপ নেয় ছাত্র জনতার মিছিলে। তখোনও শাহ মুহম্মদ আবু জাফরের নামে হুলিয়া। স্লোগান চলছে, “শাহ জাফরের হুলিয়া নিতে হবে তুলিয়া।” ডাকবাংলোর মোড়ে মিছিল বাঁধাগ্রস্ত হলো। থানার ওসি একদল পুলিশ নিয়ে বললো মিছিল আর একপাও এগোবেনা। নেতার মতোই ছিলেন শিষ্যরা। পুলিশের বাঁধা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। পাশেই সাত্তার মিয়ার বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা শাহ মুহম্মদ আবু জাফর বেরিয়ে এসে বাঘের মতো হুংকার দিলেন। শাহ জাফরকে আটক করা দূরে থাক ওসির নিচের কাপড় ভিজে গেলো। মিছিল এগিয়ে গেলো, শাহ জাফর আবার গেরিলা কায়দায় আত্মগোপনে চলে গেলেন।
১৯৭৭ সালের ৩০ মে বাংলাদেশে প্রথম “হ্যাঁ” – “না” ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ ভোটের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউর রহমান এর জনপ্রিয়তা যাচাই এবং সামরিক প্রশাসক হিসাবে বৈধতা পায়।
১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফেরার ঘোষণা দেন এবং নিজের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
১৯৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে জাগদল নামে একটি ফ্রন্ট গঠন করেন।
মূল উদ্দেশ্য: জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং ১৯-দফা কর্মসূচিকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করা।
এই দলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের (ডানপন্থী, বামপন্থী এবং মধ্যপন্থী) নেতাদের সমন্বয় করা হয়েছিল।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজের অবস্থান পোক্ত করে ১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন এবং ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়াউর রহমান জাগদলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠন করে নির্বাচনে লড়েন এবং জয়লাভ করেন। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন গতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী জেনারেল এম এ জি ওসমানী।
পরবর্তীতে, রাজনীতির আরও ব্যাপক প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন।
এরপর জাতীয় সংসদ গঠন কল্পে তিনি ঘোষণা করেন, যে সমস্ত নেতা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিবেন তাঁদের উপর থেকে হুলিয়া তুলে নেয়া হবে। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সম্মতি জানালে অনেকের সাথে শাহ মোহমদ আবু জাফরের হুলিয়াও তুলে নেয়া হয়।
বোয়ালমারীতে জনসাধারণ দুইবার জনস্রোত দেখেছে। একবার ৩ মার্চ ১৯৭৫, যেদিন চন্দনা-বারাসিয়া নদী পুনঃ খনন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পা স্পর্শ করেছিলো বোয়ালমারীর মাটি। আরেকবার যেদিন হুলিয়া থেকে মুক্তি পেয়ে শাহ মো. আবু জাফর দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যেদিন বোয়ালমারী ফিরেছিলেন।
৩০ নভেম্বর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। আব্দুল মালেক উকিল এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে বিভক্ত আওয়ামীলীগ নির্বাচন করে। আব্দুল মালেক উকিলের অংশকে মূল ধারা হিসাবে অভিহিত করা হয়। বহু প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে শাহ মো. আবু জাফর ফরিদপুর-১ আসনে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বিএনপির প্রার্থী এ্যাড.আফছার উদ্দিনকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। এই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ(মালেক)৩৯টি এবং আওয়ামীলীগ (মিজান) পেয়েছিলো ২টি।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-১ আসনে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ায় অনেকেই তাঁকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ, নেতিবাচক লেখা লিখেছেন। তাঁর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি রাজনৈতিক মাঠে ভুলের শিকার না হলে দক্ষিণ বঙ্গে তাঁর নামে দোহাই ফিরতো। দক্ষিণ বঙ্গের রাজনীতির পীর থাকতেন তিনি। ধৈর্যে মেওয়া ফলে। জাফর ভাইয়ের ভুলে দীর্ঘ রাজনৈতিক নীপিড়ন, জেল, জুলুমে ধৈর্য ধারণ করে বিজয় হয়েছে খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ভাই মনোনয়ন দৌড়ে বিজয়ী হয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে লড়ছেন। বিএনপির একটি অংশ বিরোধিতা করলেও গত নির্বাচনে প্রায় লক্ষ ভোট পাওয়া সাংবাদিক আরিফুর রহমান দোলন খন্দকার নাসিরুল ইসলামকে সমর্থন করেছেন।