অ্যাড. কোরবান আলী: দক্ষিণবঙ্গের একমাত্র নারী শিক্ষার উন্নয়নে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বনামধন্য কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজ। কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয় ০৪/১০/১৯৯৪ ইং সালে। আমিও ছিলাম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। যতদূর মনে পড়ে, বোয়ালমারী সরকারি কলেজের প্রথমদিকে বেসরকারি থাকা অবস্থায় দারুণ আর্থিক সঙ্কেট পড়ে। শিক্ষকদের বেতন বাকী পড়ায় তাদের জীবন যাত্রায় অসহায়ত্ব। তখনই লক্ষাধিক টাকা অনুদান দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন বিশিষ্ট স্বর্ণ ব্যবসায়ী আমিন জুয়েলার্সের কর্ণধার কাজী সিরাজুল ইসলাম। কলেজ কতৃপক্ষ, অনুদানের টাকা পেয়ে কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে প্রিন্সিপালের পক্ষে বিশালাকার কাজী সাহেবের একটি ছবি টাঙিয়ে দেন। মাসখানেক পর কলেজটি সরকারিকরণ হলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ছবিটিকে নামিয়ে গায়েব করে দেয়া হয়। এ নিয়ে কলেজের ভেতরে-বাইরে ও এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ওই সময় কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন ওয়াকেফ হোসেন চৌধুরী। তিনি জানিয়ে দেন তাঁর মত-ইচ্ছার বিরুদ্ধে আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে ছবিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে তিনি মনেপ্রাণে চান, ছবিটি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে উঠুক। এদিকে রায় ফার্মেসিতে বসে ছোলনা গ্রামের মরহুম আব্দুল হামিদ বাবু মিয়া, ছাত্রনেতা প্রয়াত প্রশান্ত সাহাকে ডেকে বলেন, ‘তোমার সাহেবকে বলো, তাঁর নিজ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে, তাহলে তার ছবি আর নামানো যাবে না। এরপর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল মতিন তাঁর অফিসকক্ষে এক আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আব্দুর রশিদ, ওসি শাহ্ আলম, মরহুম খসরু মিয়া, গুনবহা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মজিবুর আমীন, আমিসহ আরও বেশ কয়েকজন। পরে আব্দুল হামিদ বাবু মিয়াও আসলেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা উঠতেই জমি এবং অর্থ কোথায় পাওয়া যাবে এ প্রসঙ্গে বাবু মিয়া জানান, জায়গা পাওয়া গেলে অর্থের অভাব হবে না। তখনই ইউএনও সাহেবের নেতৃত্বে জায়গার খোঁজে বের হলাম। প্রথম ভ্যানটিতে ছিলেন ইউএনও ও মজিবুর আমীন সাহেব। অন্য ভ্যানটিতে ছিলাম আমরা কয়েকজন। মজিবুর আমীন বললেন, আমার জমি আছে রায়পুরে পছন্দ হলে জমিটি কলেজের জন্য দিয়ে দিবো। জমিটি দেখা হলো, জমিতে কলাবাগান ছিল, সখের বশে আমরা অনেকেই গাছের কলা কেটে নিয়ে এসেছিলাম। জায়গাটি ভিতরে হওয়ায় অনেকেরই পছন্দ হলো না। বাবু মিয়ার কথা মতো ঘুরে এলাম কামারগ্রামে। এই জমিটি দেখে সকলেরই পছন্দ হলো। জমিটির মালিকদের রাজি করানো হলো। ইউএনও মহোদয়, অনেকটা জোর করেই আমার বন্ধু রবিন লস্করকে কক্সবাজার থেকে আনা হলো। দায়িত্ব দেয়া হলো প্রিন্সিপালের। কাজী সিরাজুল ইসলাম নামেই ০৪/১০/১৯৯৪ ইং সালে জর্জ একাডেমীর একটি কক্ষে শুরু হলো কলেজের কার্যক্রম। মাস দেড়েকের মধ্যেই অবসরে গেলেন সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল ওয়াকিফ হোসেন চোধুরী। তাকে নিয়োগ দেয়া হলো কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল। তাঁর আপ্রাণ চেষ্টায় অল্পদিনের মধ্যে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। এ সময় সূচনা হয় কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের স্বর্ণযুগ। এরপর প্রিন্সিপাল হয়ে আসেন মো. ইদ্রিস আলী। কলেজের আভ্যন্তরে লোকখাটো লবিং গ্রুপিং শুরু হতে থাকে। সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্যস্থতায় মিমাংসাও হয়ে যায়। এ সময় প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেয়া হয়। আমি পেয়েছিলাম সেই সম্মননা। ভালোই লেগেছিল। জনাব ইদ্রিস সাহেব অবসরে গেলে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকেন ভাইস প্রিন্সিপাল আবু মোরসালিন। তার কিছুটা অদক্ষতার কারণে ক্রমান্বয়ে শিক্ষকদের বিভাজন বাড়তে থাকে। অনেক শিক্ষক পদপদবী নিয়ে জড়িয়ে পড়েন দলীয় রাজনীতিতে। ধারণা ছিল, এই পদ-পদবী কলেজের স্বার্থে ব্যবহার হবে। কিন্তু দেখা গেল পদ-পদবী ব্যবহার করে যার যার ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে উঠেপড়ে লেগে গেলেন। এর মধ্যেই অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করলেন মো. ফরিদ আহমেদ। শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই জোরালো হয় এসব অভিযোগ। হামলা-মামলা, পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন হতে থাকে। সিভিল থেকে ফৌজদারী একাধিক মামলা চলমান। দু’টি গ্রুপে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করেছে। পড়ালেখার পরিবেশ দিন দিন অবনতি হচ্ছে। এর মধ্যেই পরিচালনা পর্ষদের কমিটি পরিবর্তন হয়েছে। সভাপতি হয়েছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম রকিবুল হাসান। অনেকেরই আশা, এ কমিটি বিগত দিনের সকল বিভাজন মিটিয়ে কলেজের সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলবেন। এ আশা আমাদের সকলের। সর্বশেষ বলতে হয়, আমরা এলাকাবাসী বড়ই অকৃজ্ঞ। কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজ নিজ নামে প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যখন যা দরকার তা তিনি দিয়েছেন। কয়েক কোটি টাকা দান-অনুদান দিয়েছেন। তারপরও তাঁর পদ-পদবী নিয়ে টানা-হ্যাচড়া কম করিনি তবুও নামানো যায়নি তাঁর ছবি। চেষ্টা যে কম হয়নি একথা হলফ করে বলা যাবে না।
প্রকাশক ও সম্পাদক : অ্যাডভোকেট কোরবান আলী
Copyright © 2026 Boalmari Barta. All rights reserved.